সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার: খ্রিস্টধর্মের মহান প্রচারক

সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার (৭ই এপ্রিল, ১৫০৬ – ৩রা ডিসেম্বর, ১৫৫২) ছিলেন একজন মহান খ্রিস্টান মিশনারি এবং যিশু সোসাইটির (Society of Jesus) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও মিশনারি কার্যক্রমের জন্য তিনি পরিচিত এবং তাকে “দক্ষিণ এশিয়ার রসূল” বলা হয়।

প্রাথমিক জীবন

ফ্রান্সিস জেভিয়ারের জন্ম স্পেনের নাভারা রাজ্যের (বর্তমান বাস্ক অঞ্চল) জেভিয়ার দুর্গে ৭ই এপ্রিল, ১৫০৬ সালে। তার পুরো নাম ছিল ফ্রান্সিসকো দে জ্যাসোস ই জাভিয়ার। তরুণ বয়সেই তিনি প্যারিসে পড়াশোনা করেন এবং সেখানেই তার খ্রিস্টধর্ম প্রচারের প্রতি আগ্রহ জন্মায়।

যীশু সোসাইটি প্রতিষ্ঠা

১৫৩৪ সালে, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, তিনি ইগনাসিয়াস লোইওলা এবং আরও ছয়জনের সাথে মিলে যিশু সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টধর্মের আদর্শ প্রচার এবং মানুষকে যিশুখ্রিস্টের শিক্ষার পথে আনা।

মিশনারি কাজ শুরু

১৫৪১ সালে সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার মিশনারি হিসেবে ভারতে আসেন। তখনকার সময়ে ভারত ছিল পর্তুগিজ উপনিবেশের অংশ। গোয়া ছিল তার প্রথম কর্মক্ষেত্র, যেখানে তিনি স্থানীয় মানুষদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু করেন।

প্রধান কাজ ও স্থান

১. গোয়া: ১৫৪২ সালে তিনি গোয়াতে আসেন এবং ক্যাথলিক গির্জা স্থাপন করেন। এখানকার মৎসজীবীদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের বাণী প্রচার করেন।
২. পারাভুর এবং কেরালা: তিনি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন এবং সেন্ট থমাস খ্রিস্টানদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
৩. জাপান: ১৫৪৯ সালে, তিনি জাপানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য যাত্রা করেন এবং সেখানে প্রথম ক্যাথলিক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।

মৃত্যু

৩রা ডিসেম্বর, ১৫৫২ সালে, সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার চীনে মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনার সময় সানচিয়ান দ্বীপে (বর্তমান চীন) মারা যান। তার শরীর পরবর্তীতে গোয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তার মরদেহ সুরক্ষিতভাবে রাখা হয়।

সান্ধ্য প্রভাব ও সম্মান

সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারকে ১৬২২ সালে পোপ গ্রেগরি XV দ্বারা সাধু ঘোষণা করা হয়। তার স্মৃতি প্রতি বছর ৩রা ডিসেম্বর “সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার দিবস” হিসেবে উদযাপন করা হয়।

সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারের কিছু বিখ্যাত অলৌকিক ঘটনা

১. কাঁকড়ার মাধ্যমে ক্রুশফল ফিরে পাওয়ার অলৌকিক ঘটনা

মালাক্কা দ্বীপপুঞ্জে মিশনারি কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে, একবার ঝড়ের মধ্যে সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারের ক্রুশফল সমুদ্রে পড়ে যায়। ঝড় থেমে যাওয়ার পর, তিনি যখন তীরে হাঁটছিলেন, তখন একটি কাঁকড়া তার দিকে এগিয়ে আসে এবং তার ক্রুশফলটি তুলে ধরে। এই ঘটনা ঈশ্বরের আশীর্বাদ এবং প্রকৃতির মাধ্যমে তার প্রতি সম্মানের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।

২. মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করার অলৌকিক ঘটনা

ভারতে থাকার সময় একটি পরিবার তাদের মৃত সন্তানকে তার কাছে নিয়ে আসে। সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার গভীর প্রার্থনা করেন এবং এর পরেই শিশুটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। এই ঘটনা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।

৩. রোগ নিরাময়ের অলৌকিক ঘটনা

সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারের প্রার্থনার মাধ্যমে অনেক অসুস্থ ব্যক্তি আরোগ্য লাভ করেন। জ্বর, পক্ষাঘাত, এবং কুষ্ঠরোগসহ বিভিন্ন কঠিন অসুখ থেকে মানুষ আরোগ্য লাভ করেছিল বলে জানা যায়।

৪. ভাষার অলৌকিক ক্ষমতা

সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার এমন অনেক জায়গায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেছেন, যেখানে তিনি স্থানীয় ভাষা জানতেন না। তবে স্থানীয় মানুষদের তিনি তাদের মাতৃভাষায় সুন্দরভাবে ধর্মের বার্তা দিতে পেরেছিলেন। এটি ঈশ্বর প্রদত্ত অলৌকিক ক্ষমতা হিসেবে ধরা হয়।

৫. দেহের অবিকৃত অবস্থা

১৫৫২ সালে তার মৃত্যু হওয়ার পর, কিছু মাস পরে তার দেহ উত্তোলন করা হয় এবং দেখা যায়, গরম ও আর্দ্র পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও তার দেহ অবিকৃত ছিল। বর্তমানে তার দেহ গোয়ার বোম যিজাস গির্জায় সুরক্ষিত রাখা হয়েছে এবং তা দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আসেন।

উপসংহার

সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারের জীবন ছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার ত্যাগ এবং প্রচেষ্টার ফলে বহু মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। তার শিক্ষা এবং কাজের মাধ্যমে আমরা জানি কীভাবে নিজের বিশ্বাসকে অটুট রেখে মানবতার সেবা করা যায়।

Scroll to Top